প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে সমাপ্ত হলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন আইকনেক্ট ২০২৬
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে সমাপ্ত হলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন আইকনেক্ট ২০২৬
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত হওয়া দুই দিনব্যাপী আইকনেক্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সম্মেলনে ২৩টি দেশের ১৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ৯১১টি গবেষণাপত্র জমা পড়ে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব গবেষণাপত্র থেকে ১৪২টি গবেষণাপত্র নির্বাচিত হয়। সম্মেলনের দুই দিনে নির্বাচিত গবেষণাপত্রগুলোর উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও স্বয়ংক্রিয়তা, যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা-সহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় এসব গবেষণায় উঠে আসে।
সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আক্তার হোসেন খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের বেঙ্গালুরুর প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিবাপেরুমাল সম্পথ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আইকনেক্ট ২০২৬-এর টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. শেখ ফাত্তাহ, সম্মেলনের জেনারেল চেয়ার ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের সহযোগী ডিন প্রফেসর ড. শহীদ মো. আসিফ ইকবাল, আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর ড. সেলিয়া শাহনাজ, আইইইই বাংলাদেশ শাখার চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. ইমামুল হাসান ভূঁইয়া এবং আইকনেক্ট ২০২৬-এর আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান টুটুন চন্দ্র মল্লিক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আক্তার হোসেন খান বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর, ইন্টারনেট অব থিংস, সাইবার নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু প্রচলিত শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং তা সমাজের কল্যাণে প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জায়গা নয়; এটি নতুন ধারণা বিনিময়, গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। আইকনেক্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে এ ধরনের সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাক্রেডিটেশন শুধু একটি সনদ অর্জনের বিষয় নয়; বরং এটি শিক্ষার মান, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সমাজের প্রয়োজনের সামঞ্জস্য যাচাই ও ক্রমাগত উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া। তিনি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পাঁচটি প্রোগ্রামের অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও অভ্যন্তরীণ মান নিশ্চয়তা কমিটিকে অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো—জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে—সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, সরকার ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তরুণ গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গবেষণার পথ সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যাত হয় কিংবা প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নিয়মিত শেখা, প্রশ্ন করা এবং নতুনভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে। গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে তিনি আইকনেক্ট ২০২৬-এর সমাপ্তি হলেও সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আলোচনা, যোগাযোগ ও গবেষণা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির বলেন, “২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে এই প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হলো। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং একই সঙ্গে একটি সাহসী উদ্যোগ। সম্মেলনটি সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে সিএসই ও ইইই বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও আয়োজকরা তাঁদের সক্ষমতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গবেষণা, প্রকাশনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে যেতে হয়। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আমাদের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।”
উপাচার্য আরও বলেন, “গবেষণাকে উৎসাহিত করতে এ বছর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা কার্যক্রমে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। প্রকৌশলী অনুষদ, বিশেষ করে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণা কার্যক্রমের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিকে দেশের মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে আমরা অ্যাক্রেডিটেশন, গবেষণা, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। শুধু একটি বা দুটি বিভাগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদ ও বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে।”
সম্মেলনে নির্বাচিত ১৪২টি গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে উপাচার্য বলেন, “গবেষণাকর্মগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হলে তা প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির জন্য একটি বড় অর্জন হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
আইকনেক্ট ২০২৬ সফলভাবে আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অতিথি, গবেষক, শিক্ষক, অংশগ্রহণকারী এবং সম্মেলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, তাঁদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া এ আয়োজন সফল করা সম্ভব হতো না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে উপাচার্য জানান, ২০২৮ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আয়োজক বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। আগামী দুই বছরে বর্তমান সম্মেলনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও বৃহৎ ও সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। ছয়টি বিভাগে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ছিল প্রকল্প প্রদর্শনী, পোস্টার প্রতিযোগিতা, রোবট ফুটবল, তিন মিনিটের গবেষণা উপস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নির্দেশনা প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের গবেষণা, উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তুলে ধরেন।
আইকনেক্ট ২০২৬-এর আয়োজনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম আইকনক্লেভ ২০২৬-এরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন।
আইকনেক্ট ২০২৬-এর প্রথম গোল্ড পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা ছিল।
আয়োজকেরা জানান, আইকনেক্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সম্মেলনটি গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি সমন্বিত আয়োজনে পরিণত হয়।
২৩ দেশের ১৫৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ, ৯১১টি গবেষণাপত্র জমা এবং ১৪২টি নির্বাচিত গবেষণাপত্রের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে দুই দিনব্যাপী আইকনেক্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।
Related News
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠান আয়োজন ও শৃঙ্খলা বিষয়ে নির্দেশনাবলি
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে সমাপ্ত হলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন আইকনেক্ট ২০২৬
Saturday, 26 September, 2026
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে সমাপ্ত হলো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সম্মেলন আইকনেক্ট ২০২৬
প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক মিলনমেলায় পরিণত হওয়া দুই দিনব্যাপী আইকনেক্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হয়েছে। প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষক, প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
সম্মেলনে ২৩টি দেশের ১৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোট ৯১১টি গবেষণাপত্র জমা পড়ে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব গবেষণাপত্র থেকে ১৪২টি গবেষণাপত্র নির্বাচিত হয়। সম্মেলনের দুই দিনে নির্বাচিত গবেষণাপত্রগুলোর উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও স্বয়ংক্রিয়তা, যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা-সহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয় এসব গবেষণায় উঠে আসে।
সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আক্তার হোসেন খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের বেঙ্গালুরুর প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. শিবাপেরুমাল সম্পথ।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আইকনেক্ট ২০২৬-এর টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. শেখ ফাত্তাহ, সম্মেলনের জেনারেল চেয়ার ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের সহযোগী ডিন প্রফেসর ড. শহীদ মো. আসিফ ইকবাল, আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর ড. সেলিয়া শাহনাজ, আইইইই বাংলাদেশ শাখার চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. ইমামুল হাসান ভূঁইয়া এবং আইকনেক্ট ২০২৬-এর আয়োজন কমিটির চেয়ারম্যান টুটুন চন্দ্র মল্লিক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আক্তার হোসেন খান বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, স্বয়ংক্রিয়তা, উন্নত কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর, ইন্টারনেট অব থিংস, সাইবার নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু প্রচলিত শিক্ষাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবন সৃষ্টি এবং তা সমাজের কল্যাণে প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুধু গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জায়গা নয়; এটি নতুন ধারণা বিনিময়, গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। আইকনেক্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে এ ধরনের সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাক্রেডিটেশন শুধু একটি সনদ অর্জনের বিষয় নয়; বরং এটি শিক্ষার মান, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এবং শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সমাজের প্রয়োজনের সামঞ্জস্য যাচাই ও ক্রমাগত উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া। তিনি প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পাঁচটি প্রোগ্রামের অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও অভ্যন্তরীণ মান নিশ্চয়তা কমিটিকে অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও বলেন, দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো—জ্বালানি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে—সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, সরকার ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তরুণ গবেষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, গবেষণার পথ সবসময় সহজ নয়। অনেক সময় গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যাত হয় কিংবা প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। তাই ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে নিয়মিত শেখা, প্রশ্ন করা এবং নতুনভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে। গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবকল্যাণ ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধান এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে তিনি আইকনেক্ট ২০২৬-এর সমাপ্তি হলেও সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আলোচনা, যোগাযোগ ও গবেষণা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নছরুল কদির বলেন, “২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে এই প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হলো। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং একই সঙ্গে একটি সাহসী উদ্যোগ। সম্মেলনটি সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে সিএসই ও ইইই বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও আয়োজকরা তাঁদের সক্ষমতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গবেষণা, প্রকাশনা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে যেতে হয়। এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আমাদের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে।”
উপাচার্য আরও বলেন, “গবেষণাকে উৎসাহিত করতে এ বছর প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য প্রায় এক কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গবেষণা কার্যক্রমে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো হবে। প্রকৌশলী অনুষদ, বিশেষ করে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণা কার্যক্রমের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করছে।”
তিনি বলেন, “প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিকে দেশের মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে আমরা অ্যাক্রেডিটেশন, গবেষণা, প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। শুধু একটি বা দুটি বিভাগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদ ও বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে।”
সম্মেলনে নির্বাচিত ১৪২টি গবেষণাকর্ম আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে উপাচার্য বলেন, “গবেষণাকর্মগুলো আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হলে তা প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির জন্য একটি বড় অর্জন হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।”
আইকনেক্ট ২০২৬ সফলভাবে আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অতিথি, গবেষক, শিক্ষক, অংশগ্রহণকারী এবং সম্মেলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, তাঁদের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ ছাড়া এ আয়োজন সফল করা সম্ভব হতো না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে উপাচার্য জানান, ২০২৮ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে আয়োজক বিভাগকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। আগামী দুই বছরে বর্তমান সম্মেলনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও বৃহৎ ও সমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ আকর্ষণীয়। ছয়টি বিভাগে প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ছিল প্রকল্প প্রদর্শনী, পোস্টার প্রতিযোগিতা, রোবট ফুটবল, তিন মিনিটের গবেষণা উপস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নির্দেশনা প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের গবেষণা, উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সৃজনশীলতা তুলে ধরেন।
আইকনেক্ট ২০২৬-এর আয়োজনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের জন্য বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম আইকনক্লেভ ২০২৬-এরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রযুক্তি, গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন।
আইকনেক্ট ২০২৬-এর প্রথম গোল্ড পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা করে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা ছিল।
আয়োজকেরা জানান, আইকনেক্ট ২০২৬-এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের গবেষক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সম্মেলনটি গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি সমন্বিত আয়োজনে পরিণত হয়।
২৩ দেশের ১৫৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ, ৯১১টি গবেষণাপত্র জমা এবং ১৪২টি নির্বাচিত গবেষণাপত্রের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে দুই দিনব্যাপী আইকনেক্ট ২০২৬ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটে।